সম্প্রতি কয়েকটি স্বনামধন্য কলেজে রসায়নের এক্সটার্নাল পরীক্ষক হিসেবে কাজ করার সুযোগ হয়। এই সুবাদে প্রায় নয়টি কলেজের শিক্ষার্থীদের খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। এই অভিজ্ঞতা আমাকে বাংলাদেশের বিজ্ঞান শিক্ষার বাস্তব চিত্র নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে। শিরোনামটি কোনো বাড়াবাড়ি নয়, বরং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার এক নির্মম প্রতিফলন।
ব্যবহারিক পরীক্ষার করুণ চিত্র: একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা
রসায়নের পরীক্ষক হিসেবে আমার দায়িত্ব ছিল প্রথম ও দ্বিতীয় পত্রের ব্যবহারিক পরীক্ষা নেওয়া। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি পত্রে শিক্ষার্থীদের দুটি করে ব্যবহারিক পরীক্ষা দেওয়ার কথা। কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, অধিকাংশ শিক্ষার্থীই খাতায় মাত্র একটি করে পরীক্ষণ সম্পন্ন করেছে। এখন প্রশ্ন হলো, পরীক্ষণের জন্য বরাদ্দকৃত ১৫ নম্বর আমি তাদের কোন নীতিতে দেব? সততা ও নৈতিকতার প্রশ্নে তা দেওয়ার কোনো সুযোগই থাকে না।
এরপর যখন ব্যবহারিক খাতাগুলো যাচাই করতে শুরু করি, হতাশা আরও বাড়ে। বেশিরভাগ খাতাই অত্যন্ত দায়সারাভাবে লেখা এবং অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীরা নিজেরাই শিক্ষকের স্বাক্ষর জাল করে নিয়ে এসেছে। তাদের মধ্যে কোনো জড়তা বা সংকোচ নেই, নেই শেখার প্রতি কোনো আগ্রহ বা প্যাশন।
ভাইভা বোর্ডে শিক্ষার্থীদের নাজুক অবস্থা দেখে আমি ইচ্ছাকৃতভাবে কঠিন প্রশ্ন এড়িয়ে যাচ্ছিলাম। তাদের করা পরীক্ষণটি থেকেই খুব সাধারণ প্রশ্ন করছিলাম। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, প্রায় ৯৮% শিক্ষার্থীর মুখ থেকেই কোনো উত্তর মেলেনি। একজনকে টেবিলে রাখা তিনটি যন্ত্রের (Apparatus) মধ্য থেকে কনিক্যাল ফ্লাস্কটি আনতে বললে সে তা শনাক্ত করতে পারেনি। অক্সালিক অ্যাসিডের মতো একটি সাধারণ যৌগের রাসায়নিক সংকেত পর্যন্ত তারা লিখতে পারছিল না।
এর চেয়েও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এমন অনেক কলেজকে পরীক্ষার কেন্দ্র হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে, যেখানে বিজ্ঞানের জন্য প্রয়োজনীয় ল্যাবরেটরিই নেই। শ্রেণিকক্ষের এক কোণায় কয়েকটি টেস্টটিউব আর ব্যুরেট রেখেই যেন দায়িত্ব শেষ। এই যদি হয় বিজ্ঞান শিক্ষার পরিকাঠামো, তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় GPA-5 পাওয়া হাজারো শিক্ষার্থী কেন ন্যূনতম পাস নম্বরটুকুও অর্জন করতে পারে না, সেই উত্তর সহজেই অনুমেয়।
সংকটের পেছনের কারণগুলো কী?
এই ভঙ্গুর শিক্ষা ব্যবস্থার দায় কার? শুধু শিক্ষার্থীদের দোষ দিয়ে কি পার পাওয়া যাবে? গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, সমস্যাটি আরও গভীরে প্রোথিত।
১. নীতিগত দুর্বলতা: আমাদের নীতিনির্ধারকেরা এমন কোনো শিক্ষানীতি গ্রহণ করতে চান না, যার সুফল পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে। তাৎক্ষণিক ফলাফল দেখানোর প্রবণতার কারণে শিক্ষাব্যবস্থার মতো একটি মৌলিক বিষয় অবহেলিত থেকে যাচ্ছে।
২. শিক্ষক ও শিক্ষার মান: যেকোনো শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হলেন শিক্ষকেরা। কিন্তু আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো ও পেশাগত সুযোগ-সুবিধার অভাবে মেধাবী শিক্ষার্থীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে চান না। আবার যারা আসছেন, তাদের কাজের সঠিক তদারকি বা জবাবদিহিতার ব্যবস্থাও অপ্রতুল।
৩. বাধ্যতামূলক বিজ্ঞান শিক্ষা: কে বিজ্ঞান পড়বে, আর কে পড়বে না, তা নির্ধারিত হওয়া উচিত শিক্ষার্থীর মেধা, প্যাশন ও উদ্ভাবনী ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু আমাদের দেশে প্রায়শই শিক্ষার্থীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে বা তার সক্ষমতা যাচাই না করেই বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়।
৪. অপর্যাপ্ত পরিকাঠামো: ল্যাবরেটরি ছাড়া বিজ্ঞান শিক্ষা অকল্পনীয়। অথচ দেশের বহু স্কুল-কলেজে বিজ্ঞানের ন্যূনতম সরঞ্জামটুকুও নেই।
৫. যুগোপযোগী সিলেবাসের অভাব: ব্যবহারিক ক্লাসে এখনও মান্ধাতার আমলের লবণ শনাক্তকরণ বা অক্সালিক অ্যাসিডের তাপ নির্ণয়ের মতো পরীক্ষণেই আমরা সীমাবদ্ধ। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সিলেবাস প্রণয়ন করা হচ্ছে না।
৬. গবেষণার অভাব ও রাজনৈতিক প্রভাব: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কোনো শক্তিশালী গবেষণা উইং নেই, যা বিশ্বের সেরা শিক্ষাব্যবস্থাগুলো নিয়ে কাজ করবে এবং দেশের জন্য কার্যকর মডেল তৈরি করবে। উল্টো, রাজনৈতিক প্রভাব প্রায়শই শিক্ষাব্যবস্থার স্বাধীন বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।
৭. অপর্যাপ্ত বাজেট: জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ বা তার আশেপাশে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দিয়ে একটি শক্তিশালী প্রজন্ম বা উদ্ভাবনী জাতি গঠন করা অসম্ভব। এই বরাদ্দ ন্যূনতম ৫ শতাংশে উন্নীত করা জরুরি।
সংকট থেকে উত্তরণের পথ
এই আইসিইউতে থাকা শিক্ষাব্যবস্থাকে পুনরুদ্ধার করতে হলে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য:
১. মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকর্ষণ: শিক্ষকদের জন্য উন্নত বেতন কাঠামো, সামাজিক মর্যাদা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে মেধাবীদের এই পেশায় আসতে উৎসাহিত করতে হবে।
২. শিক্ষকদের জবাবদিহিতা: সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশেষ অডিট টিমের মাধ্যমে শিক্ষকদের কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
৩. সঠিক শিক্ষার্থী নির্বাচন: শিক্ষার্থীর আগ্রহ ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা বিচার করে তবেই তাকে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার সুযোগ দেওয়া উচিত।
৪. ল্যাব স্থাপন: অবিলম্বে দেশের প্রতিটি স্কুল-কলেজে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে আধুনিক ও কার্যকরী ল্যাব স্থাপন করতে হবে।
৫. সিলেবাস আধুনিকীকরণ: বর্তমান বিশ্বের চাহিদা অনুযায়ী ব্যবহারিক পরীক্ষার সিলেবাসকে ঢেলে সাজাতে হবে।
৬. গবেষণা ও উন্নয়ন: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি স্বাধীন গবেষণা উইং তৈরি করতে হবে, যেখানে বিশ্বের স্বনামধন্য স্কলারদের যুক্ত করে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা ও সমাধান নিয়ে কাজ করা হবে।
৭. রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও বাজেট বৃদ্ধি: শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সব ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে হবে এবং জাতীয় বাজেটের কমপক্ষে ৫% শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দিতে হবে।
শেষ কথা
ব্যবহারিক পরীক্ষার নামে ২৫ নম্বরের এই “ভিক্ষাবৃত্তি” বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। আমাদের দেশে মেধার অভাব নেই, কিন্তু সঠিক নীতির অভাবে আমরা পিছিয়ে পড়ছি। একটি ছোট ব্রিজ তৈরি করতেও যখন বিদেশ থেকে ইঞ্জিনিয়ার আনতে হয়, তখন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
উন্নত দেশগুলোতে সরকার পরিবর্তন হলেও শিক্ষানীতি অপরিবর্তিত থাকে এবং স্বাধীনভাবে কাজ করে। ইতিহাস বা বিজ্ঞান কোনো কিছুই সেখানে রাজনৈতিক মতাদর্শের হাতিয়ার হয় না। আমাদেরও সেই পথেই হাঁটতে হবে। সম্প্রতি গঠিত হওয়া নতুন সরকার একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে এই মৃত প্রায় শিক্ষাব্যবস্থাকে উদ্ধারে এগিয়ে আসবে—এখন এটাই দেখার বিষয়। নইলে এই গুরুদায়িত্ব আর কে নেবে?
মূল লেখাটি পড়ুন : মো: শহীদুল ইসলাম, প্রভাষক ও পিএইচডি গবেষক (https://www.facebook.com/md.s.islam.1426?__tn__=-UC*F)