মেধা নয়, জেদই শেষ কথা: এক ‘অযোগ্য’ কিশোরের বোর্ড সেরা হওয়ার গল্প

আমরা প্রায়ই ‘ভালো ছাত্র’ বা ‘জিনিয়াস’ শব্দগুলো ব্যবহার করি। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতায়—এগুলো স্রেফ মনগড়া ধারণা। আমি আজ বিশ্বাস করি, সাফল্যের মূল চাবিকাঠি মেধা নয়, বরং অপমানের দাঁতভাঙা জবাব দেওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা আর অমানুষিক পরিশ্রম।

​অন্ধকারের দিনগুলো

​আমার গল্পটা শুরু হয়েছিল এক স্বনামধন্য ক্যাডেট কলেজে, যেখানে আমি ছিলাম ক্লাসের ‘সেকেন্ড লাস্ট’ ছাত্র। ক্লাস এইট থেকে নাইনে ওঠার সময় আমার মার্কশিটটা ছিল ঠিক এমন:

  • অঙ্ক: ১২
  • বিজ্ঞান: ১৭
  • ইংরেজি: ২৩

​আমার পরে যে ছেলেটি ছিল, সে অসুস্থতার কারণে পরীক্ষা দিতে পারেনি। তাই আক্ষরিক অর্থেই আমি ছিলাম সবার শেষে। ক্যাডেট কলেজে রেজাল্ট খারাপ করার যে কী পরিমাণ অপমান, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানে। সিনিয়রের র‍্যাগিং, বন্ধুদের তিরস্কার আর কলেজ কর্তৃপক্ষের অবজ্ঞা—সব মিলিয়ে জীবনটা বিষিয়ে উঠেছিল। কর্তৃপক্ষ আমাকে সাফ জানিয়ে দিল, “তোমার সায়েন্স পড়ার যোগ্যতা নেই।”

​সেই মুচলেকা ও এক নিঃসঙ্গ লড়াই

​বাবা চেয়েছিলেন আমি বিজ্ঞান বিভাগেই পড়ি। কিন্তু কলেজ আমাকে জোর করে আর্টসে পাঠিয়ে দিল। ১৪ বছরের এক কিশোর হিসেবে সেই প্রত্যাখ্যান সহ্য করার মতো ছিল না। ভাইস প্রিন্সিপালের পায়ে ধরে কেঁদেছিলাম। শেষমেশ এক কঠিন শর্তে অনুমতি মিলল—আমাকে লিখিত মুচলেকা দিতে হলো যে, এসএসসি ও এইচএসসিতে আমি অন্তত ‘ফার্স্ট ডিভিশন’ পাব।

​অপমান আর টিটকারি তখনো থামেনি। কত রাত যে বাথরুমে বা কলেজের ছাদে একা কেঁদেছি, তার হিসেব নেই। কিন্তু সেই কান্না একদিন জেদে রূপ নিল। ঠিক করলাম, এই অসম্মানের উত্তর আমি দেবই।

​পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন চার বছর

​আমি নিজেকে পুরোপুরি বদলে ফেললাম। টিভি, সিনেমা, আড্ডা, আত্মীয়স্বজন—সবকিছু জীবন থেকে বাদ দিয়ে দিলাম। আমার জগৎ হয়ে উঠল শুধু বই আর খাতা।

  • ​অঙ্কের পারমুটেশন-কম্বিনেশন কীভাবে বাস্তবে কাজ করে, তা বুঝতে লাইব্রেরিতে দিনের পর দিন পড়ে থাকতাম।
  • ​বাংলার নোট তৈরি করতাম বিশ্বভারতীর বই ঘেঁটে।
  • ​ইংরেজি কবিতার গভীর অর্থ বুঝতে উঁচু ক্লাসের সমালোচনাগুলো পড়তাম।

​টানা চার বছর প্রতিদিন ১৪-১৬ ঘণ্টা পড়াশোনা করেছি। এমনকি ছুটির দিনগুলোতেও আমি পড়ার টেবিল ছাড়িনি। মা-বাবা বলতেন, “এবার থাম,” আর বন্ধুরা বলত, “তুই তো মরে যাবি!” কিন্তু আমার লক্ষ্য ছিল স্থির। ইন্টারমিডিয়েটের দুই বছরে আমি পুরো সিলেবাস শেষ করেছিলাম অন্তত সাতবার।

​মিষ্টি প্রতিশোধের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ

​অবশেষে এইচএসসির ফলাফল প্রকাশিত হলো। যে ছেলেটিকে একসময় ‘অযোগ্য’ বলে সায়েন্স থেকে বের করে দিতে চেয়েছিল, সেই ছেলেটিই দেড় লক্ষাধিক পরীক্ষার্থীর মধ্যে পুরো বোর্ডে প্রথম স্থান অধিকার করল!

​যে মিডিয়া আর মানুষগুলো আমাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত, তাদের ভিড় জমে গেল আমার বাড়িতে। প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার নিলাম, টিভিতে সাক্ষাৎকার দিলাম—এটিই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে ‘মিষ্টি প্রতিশোধ’।

​শিক্ষা: আপনি যা চান না, তা-ই পান না

​এই দীর্ঘ লড়াই থেকে আমি একটি ধ্রুব সত্য শিখেছি: সাফল্য কোনো মিরাকল নয়, এটি একান্তই আপনার চাওয়ার ওপর নির্ভর করে।

  • ​আপনি বিসিএসে প্রথম হননি? কারণ আপনি সেটা মন থেকে চাননি।
  • ​ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে জায়গা পাননি? কারণ আপনার চাওয়ায় ঘাটতি ছিল।
  • ​আপনার কাছে কোটি টাকা নেই? কারণ আপনি সেটা পাওয়ার জন্য সব বিসর্জন দিতে চাননি।

​আমরা মানুষের সাফল্য দেখি, কিন্তু তার পেছনের ত্যাগ, রক্ত আর ঘাম দেখি না। সৃষ্টিকর্তা আমাদের শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। আর শ্রেষ্ঠ জীব কখনো হারতে পারে না যদি তার মধ্যে ‘পাগল হওয়ার মতো’ জেদ থাকে।

ব্যর্থতা কোনো বিকল্প হতে পারে না। হয় সফল হোন, নতুবা চেষ্টা করতে করতে হারিয়ে যান। মাঝপথে থেমে যাওয়ার নাম জীবন নয়।

আপনার কি এমন কোনো অভিজ্ঞতার গল্প আছে যা আপনার জীবনকে বদলে দিয়েছে? কমেন্টে আমাদের সাথে শেয়ার করতে পারেন।

About The Author

About Admin

Check Also

মিড টার্ম পরীক্ষার অনুশীলনের জন্য সৃজনশীল প্রশ্ন, চট্টগ্রাম বেপজা কলেজ

বেপজা পাবলিক স্কুল ও কলেজ , চট্টগ্রাম ইপিজেড হিসাববিজ্ঞান প্রথমপত্র মিড টার্ম পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য …

Leave a Reply

error: Content is protected !!
Skip to toolbar