পর্ব ৩: শিক্ষার্থীর অধিকার ও দায়িত্ব—নতুন শিক্ষাব্যবস্থায় একজন শিক্ষার্থীর ভূমিকা
“শিক্ষার সহজ পাঠ”-এর প্রথম দুই পর্বে আমরা আইন ও নীতিমালার আলোকে শিক্ষা এবং একজন আদর্শ শিক্ষকের ভূমিকা সম্পর্কে জেনেছি। শিক্ষার এই বৃহৎ প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শিক্ষার্থী। একটি শিক্ষাব্যবস্থা তখনই সফল হয়, যখন শিক্ষার্থী তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয় এবং একই সঙ্গে তার দায়িত্ব পালনেও যত্নশীল হয়। আজকের পর্বে আমরা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আলোকে একজন শিক্ষার্থীর আইনি অধিকার ও নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা করব।
আইনের চোখে শিক্ষার্থীর অধিকার
শিক্ষার্থী কেবল একজন পাঠক বা শ্রোতা নয়; সে শিক্ষার একজন সক্রিয় অংশীদার। বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষানীতি ও প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনে শিক্ষার্থীর কিছু সুনির্দিষ্ট অধিকারের কথা বলা হয়েছে:
- মানসম্মত শিক্ষা লাভের অধিকার: প্রতিটি শিক্ষার্থীর মানসম্মত শিক্ষা লাভের অধিকার রয়েছে, যা বৈষম্যমুক্ত পরিবেশে পরিচালিত হবে। এটি শুধু ভালো ফলাফল অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এমন একটি শিক্ষা নিশ্চিত করা, যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রস্তুত করবে।
- নিরাপদ ও ভীতিমুক্ত পরিবেশের অধিকার: শিক্ষকের শারীরিক বা মানসিক শাস্তি থেকে মুক্ত থাকার অধিকার প্রতিটি শিক্ষার্থীর রয়েছে। প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনে শিক্ষার্থীর প্রতি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিটি শিক্ষার্থী একটি নিরাপদ ও ভীতিমুক্ত পরিবেশে শিখতে পারবে।
- বিকাশের সার্বিক সুযোগ: আইন ও নীতিমালায় শিক্ষার্থীর শারীরিক, মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। তাই শুধু পাঠ্যবই নয়, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং অন্যান্য সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের অধিকারও তার রয়েছে। এর মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী সুষমভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়।
- মত প্রকাশের স্বাধীনতা: একজন শিক্ষার্থীর প্রশ্ন করার, আলোচনায় অংশ নেওয়ার এবং নিজের মতামত নির্ভয়ে প্রকাশ করার অধিকার আছে। এটি তার মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার (critical thinking) বিকাশ ঘটায় এবং তাকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।
অধিকারের পাশাপাশি দায়িত্ববোধও জরুরি
অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই সেই অধিকারকে সম্মান জানানোর জন্য কিছু দায়িত্ব পালন করাও অপরিহার্য। একজন আদর্শ শিক্ষার্থী তার অধিকার ভোগের পাশাপাশি তার দায়িত্ব সম্পর্কেও সচেতন থাকে।
- শেখার প্রতি নিষ্ঠাবান হওয়া: একজন শিক্ষার্থীর প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো নিজের শেখার প্রক্রিয়ায় মনোযোগী ও নিষ্ঠাবান হওয়া। শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ দেওয়া, নিয়মিত পড়াশোনা করা এবং নিজ নিজ কাজ সময়মতো সম্পন্ন করা তার কর্তব্য।
- শিক্ষক ও সহপাঠীদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ: শিক্ষক কেবল পাঠদানকারী নন, তিনি একজন পথপ্রদর্শক। তার প্রতি যথাযথ সম্মান দেখানো এবং সহপাঠীদের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক আচরণ করা একজন শিক্ষার্থীর নৈতিক দায়িত্ব।
- বিদ্যালয়ের পরিবেশ রক্ষা: বিদ্যালয় শুধু একটি ভবন নয়, এটি শিক্ষার্থীর দ্বিতীয় ঘর। বিদ্যালয়ের নিয়মকানুন মেনে চলা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং প্রতিষ্ঠানের সম্পদ রক্ষা করাও তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
- মূল্যবোধের প্রয়োগ: শিক্ষা কেবল শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়। সততা, শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা ও সহযোগিতা—এইসব মূল্যবোধকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা একজন শিক্ষার্থীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, যা তাকে একজন যোগ্য সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে।
পরিশেষে, একজন শিক্ষার্থীকে কেবল তার অধিকারের বিষয়ে জানালেই চলবে না, তাকে দায়িত্বের গুরুত্বও বুঝতে হবে। এই ভারসাম্যপূর্ণ বোঝাপড়াই তাকে একজন দায়িত্বশীল, সচেতন এবং পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। শিক্ষার আইন ও নীতিমালা শিক্ষার্থীর জন্য শুধু সুযোগ তৈরি করে না, বরং তাকে একটি আদর্শ জীবনের পথে পরিচালিত করার জন্য একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনাও দেয়।
তথ্যসূত্র:
- জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।
- শিক্ষা আইন ২০২৪ (খসড়া), গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।