Breaking News

সিরিজ: বাংলাদেশে শিক্ষার রূপান্তর: ফিরে দেখা পঞ্চাশ বছরের শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট

পর্ব-২: কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন (১৯৭৪): একটি যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থার foundational blueprint

একটি নতুন জাতির জন্মের পর তার সবচেয়ে বড় কাজটি হলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি পথের দিশা তৈরি করা। গত পর্বে আমরা এই পথ তৈরির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আলোচনা করেছি। আজ আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের সেই পথচলার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক—ড. কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন, ১৯৭৪-এর একটি বস্তুনিষ্ঠ ও গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরব।

এই প্রতিবেদনটি নিছক কিছু সুপারিশের সমষ্টি ছিল না; এটি ছিল সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত একটি দেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার নিরিখে, একটি আধুনিক ও আত্মনির্ভরশীল জাতি গঠনের সুচিন্তিত নীলনকশা। ১৯৭২ সালের ২৬শে জুলাই, প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ কুদরত-এ-খুদার নেতৃত্বে গঠিত এই কমিশন প্রায় দুই বছর নিবিড় গবেষণা ও পর্যালোচনার পর ১৯৭৪ সালের ৩০শে মে সরকারের কাছে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করে। আসুন, এর বিভিন্ন দিক নিয়ে একটি নিরপেক্ষ ও গঠনমূলক পর্যালোচনা করা যাক।

কমিশনের দর্শনের ভিত্তি: সংবিধান ও বাস্তবতা

কুদরত-এ-খুদা কমিশনের প্রতিটি প্রস্তাবের পেছনে ছিল বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানের সুস্পষ্ট প্রতিফলন। সংবিধানের ১৭ নং অনুচ্ছেদে একটি “একই পদ্ধতির গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা” প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তাকেই বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল এই কমিশন। এর দর্শনের চারটি প্রধান স্তম্ভ ছিল:

১. ধর্মনিরপেক্ষতা ও নৈতিকতা: কমিশন একটি অসাম্প্রদায়িক শিক্ষাব্যবস্থার প্রস্তাব করে, যেখানে কোনো ধর্মকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রাধান্য দেওয়া হবে না। তবে সকল শিক্ষার্থীর জন্য নিজস্ব ধর্ম ও নৈতিকতা শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছিল, যা একটি বহুত্ববাদী সমাজের জন্য অপরিহার্য।

২. বিজ্ঞানভিত্তিক ও যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি: আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য প্রাথমিক স্তর থেকেই বিজ্ঞান শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হয়। এর লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুসন্ধিৎসা, যুক্তিবাদী চিন্তাভাবনা এবং সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা।

৩. উৎপাদনমুখী ও কর্মমুখী শিক্ষা: কমিশন বুঝতে পেরেছিল যে, শুধু পুঁথিগত বিদ্যায় দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে না। তাই তারা শিক্ষাকে দেশের কৃষি, শিল্প ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার প্রস্তাব দেয়। এর মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

৪. সার্বজনীন ও গণমুখী শিক্ষা: শিক্ষাকে ছোট অধিকার না রেখে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য সহজলভ্য করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এর লক্ষ্য ছিল শহর ও গ্রামের মধ্যে শিক্ষার বৈষম্য দূর করে একটি শিক্ষিত জাতি গঠন করা।

সুপারিশমালার সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য

কমিশনের সুপারিশগুলো ছিল অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও যুগোপযোগী। এর প্রধান দিকগুলো হলো:

শিক্ষার সমন্বিত কাঠামো: কমিশন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক, নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক এবং তিন বছর মেয়াদী স্নাতক স্তরের প্রস্তাব করে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে পরীক্ষার চাপ কমিয়ে একটি নিরবচ্ছিন্ন ও সমন্বিত শিক্ষা নিশ্চিত করা। লক্ষ্য ছিল ১৯৮৩ সালের মধ্যে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা।

মাধ্যমিক শিক্ষায় বহুমুখী সুযোগ: শিক্ষার্থীদের মেধা ও আগ্রহ অনুযায়ী পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ করে দিতে নবম শ্রেণি থেকে সাধারণ শিক্ষাবৃত্তিমূলক শিক্ষার দুটি আলাদা ধারার প্রস্তাব করা হয়। বৃত্তিমূলক ধারায় কৃষি, প্রযুক্তি, শিল্পসহ বিভিন্ন কর্মমুখী বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা একজন শিক্ষার্থীকে পড়াশোনা শেষে আত্মনির্ভরশীল হতে সরাসরি সহায়তা করত।

মাতৃভাষার মাধ্যমে জ্ঞানচর্চা: কমিশন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সকল স্তরে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলাকে ব্যবহারের সুপারিশ করে। এর ফলে জ্ঞানচর্চা সাধারণ শিক্ষার্থীর জন্য অনেক বেশি সহজ ও বোধগম্য হতো, যা মেধা বিকাশের পথকে সুগম করত।

আধুনিক পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন: পাঠ্যক্রম থেকে অপ্রয়োজনীয় ও মুখস্থনির্ভর অংশ বাদ দিয়ে সেখানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে, গতানুগতিক পরীক্ষার পরিবর্তে শিক্ষার্থীর সারা বছরের কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে ধারাবাহিক মূল্যায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়।

বাস্তবায়নের প্রেক্ষাপট ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব

যেকোনো বড় সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন হয় অনুকূল রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ। কুদরত-এ-খুদা কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান ছিল:

রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন: ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের শাসনতান্ত্রিক ও উন্নয়নমূলক দর্শনে পরিবর্তন আসে। ফলে নতুন সরকারগুলোর অগ্রাধিকার ভিন্ন হওয়ায় এই প্রতিবেদনটি তার মূল দর্শন অনুযায়ী বাস্তবায়নের সুযোগ পায়নি।

অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা: একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের জন্য রাতারাতি সারা দেশে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা চালু করা, নতুন অবকাঠামো নির্মাণ এবং লক্ষ লক্ষ শিক্ষককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনার জন্য যে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন ছিল, তা জোগান দেওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।

প্রশাসনিক ও সামাজিক প্রস্তুতি: এত বড় একটি সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য যে ধরনের প্রশাসনিক কাঠামো এবং সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন, তা রাতারাতি অর্জন করা সম্ভব ছিল না। বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে সামাজিকভাবে গ্রহণ করার জন্য ব্যাপক জনসচেতনতার প্রয়োজন ছিল।

উত্তরাধিকার: একটি দিকনির্দেশক দলিল

বাস্তবায়িত না হওয়া সত্ত্বেও কুদরত-এ-খুদা কমিশনের গুরুত্ব সামান্যও কমেনি। এই প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি ‘ধ্রুবতারা’ বা ‘Guiding Document’ হিসেবে আজও প্রাসঙ্গিক। এর প্রভাবগুলো হলো:

পরবর্তী নীতিমালার ভিত্তি: এই কমিশনের দর্শন ও কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী প্রায় সকল শিক্ষা কমিশন ও শিক্ষানীতি প্রণীত হয়েছে। ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করার যে ধারণাটি গৃহীত হয়েছে, তার উৎস এই কমিশন।

আধুনিক শিক্ষার মানদণ্ড: একটি আধুনিক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত, তার একটি মানদণ্ড তৈরি করে দিয়েছে এই কমিশন। আজও শিক্ষা সংক্রান্ত যেকোনো আলোচনায় এই কমিশনের রেফারেন্স টানা হয়।

শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের জন্য অনুপ্রেরণা: এই প্রতিবেদনটি দেশের শিক্ষাবিদ, গবেষক ও নীতি নির্ধারকদের জন্য একটি অমূল্য গবেষণা উপকরণ হিসেবে কাজ করে চলেছে।

সারকথা

কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনকে শুধু বাস্তবায়িত বা অবাস্তবায়িত হওয়ার নিরিখে বিচার করাটা সমীচীন নয়। এর আসল সাফল্য হলো, এটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য একটি স্বাধীন ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রথম সুস্পষ্ট রূপরেখা দিয়েছিল। এর সুপারিশগুলো ছিল বাস্তবসম্মত, সুচিন্তিত এবং বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত। সময়ের পরিবর্তনে অনেক কিছু বদলে গেলেও, একটি শিক্ষিত ও উন্নত জাতি গঠনের যে স্বপ্ন এই প্রতিবেদনে দেখা হয়েছিল, তা আজও আমাদের জন্য এক অফুরন্ত অনুপ্রেরণার উৎস।

তথ্যসূত্র:

  1. বাংলাদেশ শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট (ড. কুদরত-এ-খুদা কমিশন), ১৯৭৪, বাংলাদেশ সরকার, ঢাকা।
  2. Ahmed, Manzoor (2018). The State of Education in Bangladesh: From Crisis to Development. University Press Limited.
  3. জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

পাঠক ভাবনা ও আলোচনা

আজকের প্রশ্ন: প্রায় ৫০ বছর পরেও ড. কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের মূলনীতিগুলো (যেমন: ধর্মনিরপেক্ষ, বিজ্ঞানভিত্তিক ও কর্মমুখী শিক্ষা) আজকের বাংলাদেশে কতটা প্রাসঙ্গিক বলে আপনি মনে করেন?

আপনার মতামত আমাদের জানান নিচের কমেন্ট বক্সে অথবা ‘খোলাবই’-এর ফেসবুক পেজে!

About Admin

Check Also

এইচএসসি পরীক্ষা ২০২৬: পূর্ণ সিলেবাস ও নম্বরেই ফিরছে পরীক্ষা

শিক্ষার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ খবর! ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিতব্য এইচএসসি, আলিম এবং সমমানের পরীক্ষাগুলো সম্পূর্ণ সিলেবাসে …

Leave a Reply

error: Content is protected !!
Skip to toolbar