গ্রীষ্মের তীব্র গরমের সঙ্গে সঙ্গে দেশজুড়ে লোডশেডিং আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম—সর্বত্রই বিদ্যুতের আসা-যাওয়া নিয়ে মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে, শিল্পকারখানার উৎপাদনে ছন্দপতন ঘটেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—যে দেশ কয়েক বছর আগেও “শতভাগ বিদ্যুতায়ন” উদ্যাপন করেছে, সেখানে হঠাৎ এত লোডশেডিং কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দোষারোপ বা হতাশার আশ্রয় না নিয়ে বরং ঠান্ডা মাথায় তথ্য-উপাত্তের দিকে তাকানো জরুরি। কারণ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান পরিস্থিতি আসলে ব্যর্থতার গল্প নয়; এটি বরং একটি রূপান্তরের সন্ধিক্ষণ—যেখানে অতীতের কিছু কাঠামোগত ভুল শুধরে নিয়ে টেকসই ভবিষ্যতের ভিত গড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাস্তব চিত্র: সক্ষমতা আছে, চ্যালেঞ্জ সরবরাহে
সংখ্যাগুলো প্রথমে দেখে নেওয়া যাক, কারণ ভুল বা পুরোনো সংখ্যা অনেক সময় জনমনে অহেতুক বিভ্রান্তি ছড়ায়।
বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী দেশের স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা এখন প্রায় ২৭ থেকে ২৯ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু চাহিদা সম্পর্কে যে ধারণা অনেকের মধ্যে রয়ে গেছে—অর্থাৎ সর্বোচ্চ চাহিদা ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট—তা আর পুরোপুরি সঠিক নয়। ২০২৬ সালের আগস্টের তথ্য বলছে, ১১ আগস্ট রাত ৯টায় সর্বোচ্চ চাহিদা উঠেছিল প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াটে (১৮,০৪৩ মেগাওয়াট), যেখানে সরবরাহ ছিল প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট, আর রাতের কোনো কোনো সময়ে তা সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটও ছাড়িয়ে যায় (ডেইলি স্টার ও ঢাকা ট্রিবিউন, আগস্ট ২০২৬)।
অর্থাৎ কাগজে-কলমে আমাদের সক্ষমতা চাহিদার প্রায় দেড় গুণ থাকলেও বাস্তবে সেই সক্ষমতার একটি বড় অংশ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এখানেই সমস্যার মূল—ঘাটতি উৎপাদন-অবকাঠামোর নয়, বরং সেই অবকাঠামো চালু রাখার জ্বালানির।
সমস্যার প্রকৃত উৎস: জ্বালানি ও ডলার
সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো গ্যাস-সংকট। দেশের গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট হলেও পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে সম্প্রতি সেগুলো থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াটের কমও উৎপাদন হচ্ছে। জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে দৈনিক প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট থেকে ২১৫ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছিল—প্রায় ৪৩ শতাংশ ঘাটতি। দেশের প্রায় ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৬০-এর বেশি কেন্দ্র কমবেশি জ্বালানি-সংকটে ভুগছে (আইটিভি বিডি, প্রথম আলো)।
এই গ্যাস-সংকট আরও ঘনীভূত হয় আমদানি-অবকাঠামোর ওপর অতিনির্ভরতার কারণে। মহেশখালী ও কক্সবাজার উপকূলে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) যান্ত্রিক বিপর্যয় ঘটায় পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ একধাক্কায় ১৭ শতাংশের বেশি কমে যায়। একটি মাত্র টার্মিনালের ত্রুটিতেই যখন গোটা ব্যবস্থা টালমাটাল হয়, তখন বোঝা যায় ঝুঁকি কতটা কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামষ্টিক অর্থনীতির চাপ। বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় এলএনজি, কয়লা ও জ্বালানি তেল—প্রায় সবই আমদানিনির্ভর, এবং এগুলোর দাম মেটাতে হয় ডলারে। জ্বালানি ও অর্থনীতিবিষয়ক গবেষণা সংস্থা আইইইএফএ-এর হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় ৬৫ শতাংশই এসেছে আমদানিনির্ভর উৎস থেকে, আর গত পাঁচ বছরে আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে প্রায় ৬৩ শতাংশ। ডলারের সরবরাহে টান পড়লে তাই সরাসরি ধাক্কা লাগে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। সক্ষমতা অলস বসে থাকে কেবল জ্বালানি কেনার সামর্থ্যের অভাবে।
ক্যাপাসিটি চার্জ: সংখ্যার সঠিক চিত্র
বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে আলোচিত কাঠামোগত দুর্বলতা হলো “ক্যাপাসিটি চার্জ” বা সক্ষমতা মাশুল। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, অনেক বেসরকারি কেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও কেবল প্রস্তুত থাকার জন্য নির্দিষ্ট হারে অর্থ পায়। এখানে একটি জরুরি সংশোধন প্রয়োজন, কারণ এ নিয়ে প্রচলিত অনেক তথ্য বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ব্যয় ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা, আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ এটি “কয়েক হাজার কোটি টাকা”র বিষয় নয়; বার্ষিক ব্যয় ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। একইভাবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কাছে বিভিন্ন উৎপাদকের পাওনা বকেয়ার পরিমাণও কয়েক হাজার কোটি নয়, বরং সব মিলিয়ে ৫০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি বলে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।
এই সঠিক সংখ্যাগুলো জানা জরুরি দুটি কারণে। প্রথমত, এতে সংকটের প্রকৃত মাত্রা বোঝা যায়—চাপটি অনেক বড়। দ্বিতীয়ত, এতে বোঝা যায় সমাধান কেন কেবল “আরও কেন্দ্র নির্মাণ” নয়, বরং বিদ্যমান কাঠামোর সংস্কারের মধ্যেই নিহিত। অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি করে তা অলস ফেলে রাখলে ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা আরও বাড়ে; তাই ভবিষ্যতের পথটি হতে হবে দক্ষতা ও স্বচ্ছতার।
এখানে একটি ইতিবাচক দিকও আছে। মাঠপর্যায়ের যে কর্মীরা—পল্লী বিদ্যুৎ বা স্থানীয় বিতরণ কোম্পানির প্রকৌশলী ও কর্মচারীরা—প্রায়ই মানুষের ক্ষোভের মুখোমুখি হন, তাঁদের হাতে আসলে উৎপাদন বা জ্বালানি সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ নেই। তাঁরা কেবল যতটুকু বিদ্যুৎ গ্রিড থেকে পান, ততটুকুই ন্যায্যভাবে বণ্টনের চেষ্টা করেন। সমস্যাটি ব্যক্তির নয়, ব্যবস্থার—এটি মনে রাখলে সমাধানও সঠিক জায়গায় খোঁজা সহজ হয়।
উত্তরণের বাস্তবমুখী পথ
আশার কথা হলো, এই সংকটের সমাধানগুলো অজানা কিছু নয়; বরং অনেকগুলোর ওপর ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। সংস্কারের পথে কয়েকটি বাস্তবমুখী পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে কয়েক মাসের মধ্যেই সহনীয় পর্যায়ে আনতে পারে।
এক, চুক্তিতে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা। ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে করা হলে খরচ কমবে এবং জবাবদিহি বাড়বে। ইতিমধ্যে বিদ্যুৎ খাতে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে করা বিশেষ আইনটি (কুইক এনহ্যান্সমেন্ট অব ইলেকট্রিসিটি অ্যান্ড এনার্জি সাপ্লাই আইন), যেটির আওতায় বিনা দরপত্রে অনেক চুক্তি হতো, তা বাতিল করা হয়েছে—যদিও চলমান প্রকল্পগুলোর বিদ্যমান চুক্তি আপাতত বহাল থাকছে। এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর নজির।
দুই, একক ক্রেতার মডেল থেকে ক্রমশ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে। বর্তমানে সরকারই কার্যত সব বেসরকারি কেন্দ্রের একমাত্র ক্রেতা। পর্যায়ক্রমে যদি বড় শিল্পগ্রাহকদের সরাসরি বেসরকারি উৎপাদকের (আইপিপি) কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে সরকারের ওপর ভর্তুকি ও জ্বালানি কেনার আর্থিক চাপ ভাগ হয়ে যাবে এবং একটি প্রকৃত বিদ্যুৎ-বাজার গড়ে উঠবে। এটি একদিনে সম্ভব নয়, তবে দিকনির্দেশনা হিসেবে সঠিক।
তিন, দক্ষতা—নতুন সক্ষমতার আগে। আইইইএফএ-এর গবেষণা বলছে, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে জ্বালানি-ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা (এনার্জি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) চালু করলে প্রথম বছরেই গড়ে প্রায় ১১ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব; কিছু ক্ষেত্রে তা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। পুরোনো জেনারেটর প্রতিস্থাপন ও অপচয় রোধ করে বিপুল পরিমাণ আমদানি করা এলএনজি বাঁচানো যায়। অর্থাৎ যে বিদ্যুৎ আমরা এখনই সাশ্রয় করতে পারি, তা কার্যত নতুন উৎপাদনেরই সমান।
চার, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ। আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সৌর ও বায়ুবিদ্যুতে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার। এটি শুধু পরিবেশবান্ধব নয়, দীর্ঘমেয়াদে ডলার-নির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তাও নিশ্চিত করে। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, বিশেষ করে শিল্প-অঞ্চল ও সরকারি স্থাপনায়, তুলনামূলক কম সময়েই ফল দিতে পারে।
পাঁচ, বকেয়া পরিশোধ ও অবকাঠামোর ঝুঁকি বণ্টন। উৎপাদকদের বকেয়া ধাপে ধাপে পরিশোধের একটি নির্ভরযোগ্য রূপরেখা থাকলে তাঁরা নিরবচ্ছিন্নভাবে উৎপাদনে ফিরতে পারবেন। পাশাপাশি একাধিক এলএনজি টার্মিনাল ও সরবরাহ-উৎসের ব্যবস্থা রাখলে একটিমাত্র যান্ত্রিক ত্রুটিতে গোটা দেশ অন্ধকারে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি কমবে।
শেষ কথা
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের আজকের সংকট মূলত জ্বালানি সরবরাহ, বৈদেশিক মুদ্রা এবং অতীতের কিছু কাঠামোগত সিদ্ধান্তের সম্মিলিত ফল—প্রযুক্তিগত অক্ষমতার নয়। অবকাঠামোগত সক্ষমতা আমাদের হাতে আছে; প্রয়োজন সেই সক্ষমতার দক্ষ, স্বচ্ছ ও পরিকল্পিত ব্যবহার।
সংকটের সংখ্যাগুলো বড়—চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছুঁয়েছে, ক্যাপাসিটি চার্জ বছরে ৪২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, বকেয়া প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এই সংখ্যাগুলোকে সঠিকভাবে জানা ও স্বীকার করাই সমাধানের প্রথম ধাপ। সঠিক তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে যদি প্রতিযোগিতামূলক বাজার, জ্বালানি-দক্ষতা, নবায়নযোগ্য বিনিয়োগ ও স্বচ্ছ চুক্তির পথে ধারাবাহিকভাবে হাঁটা যায়, তবে অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফেরা শুধু সম্ভব নয়, তা নাগালের মধ্যেই। সরকার, নীতিনির্ধারক, বেসরকারি খাত ও সচেতন নাগরিক—সবার সম্মিলিত ও তথ্যনির্ভর প্রচেষ্টাই পারে এই সন্ধিক্ষণকে একটি স্থায়ী উত্তরণে রূপ দিতে।
তথ্যসূত্র
- ঢাকা ট্রিবিউন, “Gas shortage deepens Bangladesh power crisis, load-shedding hits 3,592MW” (আগস্ট ১৩, ২০২৬) — https://www.dhakatribune.com/bangladesh/power-energy/417337/gas-shortage-deepens-bangladesh-power-crisis
- The Daily Star, “Lingering LNG crisis may drag power cut woes” (আগস্ট ২০২৬) — https://www.thedailystar.net/news/environment/natural-resources/energy/news/lingering-lng-crisis-may-drag-power-cut-woes-4246531
- প্রথম আলো, “Power plants: Capacity charge rises to Tk 420bn” — https://en.prothomalo.com/bangladesh/00fsa9wn5e
- আইটিভি বিডি, “২৯ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার পরও কেন দেশে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট?” — https://www.itvbd.com/analysis/272444/why-bangladesh-is-facing-severe-power-crisis-load
- IEEFA, “Heavy import reliance fuels Bangladesh’s power sector woes” — https://ieefa.org/resources/heavy-import-reliance-fuels-bangladeshs-power-sector-woes
- IEEFA, “Fixing Bangladesh’s Power Sector” (ডিসেম্বর ২০২৪) — https://ieefa.org/resources/fixing-bangladeshs-power-sector
- আইটিভি বিডি, “কুইক রেন্টাল আইন বাতিল, তবে প্রকল্প চলবে” — https://www.itvbd.com/economy/267311
- বাংলা ট্রিবিউন, “বিদ্যুৎ খাত সংস্কারে যেসব কাজ চলছে” — https://www.banglatribune.com/national/904479
