পর্ব ২: আদর্শ শিক্ষক কে? আইন ও শিক্ষানীতির আলোকে শিক্ষকের ভূমিকা ও দায়িত্ব
“শিক্ষার সহজ পাঠ”-এর প্রথম পর্বে আমরা আইন ও নীতিমালার আলোকে ‘শিক্ষা’র প্রকৃত অর্থ ও তার ব্যাপকতা নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা জেনেছি যে, শিক্ষা কেবল জ্ঞান অর্জন নয়, বরং শিক্ষার্থীর নৈতিক, মানবিক ও সামাজিক বিকাশ ঘটানোর একটি সামগ্রিক প্রক্রিয়া। এই মহৎ প্রক্রিয়ার মূল চালিকাশক্তি হলেন শিক্ষক। তাই আজকের পর্বে আমরা জানব, বাংলাদেশের আইন ও শিক্ষানীতি অনুযায়ী একজন আদর্শ শিক্ষকের ভূমিকা, দায়িত্ব এবং কর্তব্যগুলো কী কী।
আইনের চোখে শিক্ষক: কেবল একজন শিক্ষক নন
শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র হলেন শিক্ষক। তাকে আইনি ও নীতিগতভাবে কিছু সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও ভূমিকার মধ্যে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যা তাকে কেবল একজন পাঠদানকারী হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখে না।
- জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০: এই নীতিমালায় শিক্ষককে “জাতি গঠনের মূল কারিগর” হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এতে শিক্ষকের পেশাগত দক্ষতা, সততা, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ওপর বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে। শিক্ষানীতি অনুযায়ী, শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেওয়া নয়, বরং শিক্ষার্থীর মধ্যে দেশপ্রেম, বিজ্ঞানমনস্কতা, সৃজনশীলতা এবং মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা।
- প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন ২০২৪ (খসড়া): এই আইন অনুযায়ী, শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষে একটি নিরাপদ ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার্থীর শারীরিক ও মানসিক শাস্তিকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং শিক্ষকের দায়িত্ব হলো প্রতিটি শিক্ষার্থীর মেধা ও সামর্থ্য অনুযায়ী তার বিকাশে সহায়তা করা।
বাস্তব প্রেক্ষাপটে একজন শিক্ষকের প্রধান দায়িত্বসমূহ
আইন ও নীতিমালার এই নির্দেশনাগুলোকে বাস্তবে প্রয়োগ করার জন্য একজন শিক্ষককে একাধিক ভূমিকা পালন করতে হয়।
১. জ্ঞানের সহায়ক (Facilitator): আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষক কেবল জ্ঞানদাতা নন, তিনি একজন সহায়ক বা ফ্যাসিলিটেটর। তার কাজ হলো শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে, ভাবতে এবং নিজে থেকে সমস্যার সমাধান করতে উৎসাহিত করা। মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে তাদের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার (critical thinking) বিকাশ ঘটানো তার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
২. নৈতিক পথপ্রদর্শক (Moral Guide): শ্রেণিকক্ষের বাইরেও শিক্ষক তার विद्यार्थ्या জন্য একজন আদর্শ। তার আচরণ, কথাবার্তা ও সততা শিক্ষার্থীদের গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সততা, সময়ানুবর্তিতা, শ্রদ্ধা ও শৃঙ্খলার মতো মানবিক গুণাবলী তিনি নিজের আচরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঞ্চারিত করেন।
৩. পেশাগত উন্নয়ন (Professional Development): বিশ্ব প্রতিনিয়ত পাল্টাচ্ছে, এবং তার সাথে শিক্ষাদানের পদ্ধতিও। একজন আদর্শ শিক্ষক সবসময় নতুন জ্ঞান ও কৌশল আয়ত্ত করার চেষ্টা করেন। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, কর্মশালা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে তিনি নিজেকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করেন, যা তার শিক্ষার্থীদের উপকারে আসে।
৪. শিক্ষার্থীর অভিভাবক ও পরামর্শদাতা (Guardian & Counselor): বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা তাদের দিনের একটি বড় অংশ কাটায়। এই সময়ে শিক্ষকই তাদের অভিভাবক। শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং তাদের ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যাগুলো শুনে একজন পরামর্শদাতার মতো পাশে দাঁড়ানোও শিক্ষকের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
৫. মূল্যায়নকারী (Evaluator): শিক্ষার্থীর অগ্রগতি নিরূপণের জন্য নিরপেক্ষ ও সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা শিক্ষকের আরেকটি বড় কর্তব্য। পরীক্ষার নম্বরই শিক্ষার্থীর একমাত্র পরিচয় নয়। তার আচার-আচরণ, সৃজনশীলতা এবং অন্যান্য সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ—এসব কিছুকেই মূল্যায়নের আওতায় আনা একজন আদর্শ শিক্ষকের দায়িত্ব।
<
p style=”text-align: justify;”>পরিশেষে, একজন শিক্ষক হলেন একাধারে একজন মালী, যিনি যত্ন করে একটি চারাগাছকে বটবৃক্ষে রূপান্তরিত করেন; একজন শিল্পী, যিনি কাদামাটিকে সুন্দর অবয়ব দেন; এবং একজন পথপ্রদর্শক, যিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আলো জ্বালিয়ে রাখেন। আইন ও নীতিমালা কেবল তার দায়িত্বের রূপরেখা দেয়, কিন্তু প্রকৃত শিক্ষক তার কাজকে একটি ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য সফল হতে পারে।