সরকারি কলেজের শিক্ষকতা পেশা নিয়ে সাধারণ মানুষের একটি প্রচলিত ধারণা হলো—শিক্ষকদের অনেক ছুটি। গ্রীষ্মের ছুটি, শীতের ছুটি বা রোজার ছুটি মিলিয়ে তারা বেশ দীর্ঘ একটি সময় অবসরে কাটান। সরকারি পরিভাষায় একে বলা হয় ‘ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্ট’ (অবকাশ বিভাগ)।
কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠের গল্পটা ভিন্ন। এই দীর্ঘ ছুটির ফাঁদে পড়ে শিক্ষকরা অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তাদের মতো ‘শ্রান্তি বিনোদন ভাতা’ (প্রতি ৩ বছর পর মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ ও ১৫ দিনের ছুটি) এবং অবসরের পর ‘অর্জিত ছুটির’ আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। অথচ ছুটির সময়েও শিক্ষকদের পরীক্ষা গ্রহণ, খাতা দেখা বা প্রশাসনিক কাজে ঠিকই ব্যস্ত থাকতে হয়।
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই বৈষম্য দূর করতে সম্প্রতি সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় বেতন কমিশনের চিঠির ভিত্তিতে বিসিএস (সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষা) ক্যাডার এবং শিক্ষকদের ‘নন-ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্ট’-এর সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে।
চলুন, পুরো বিষয়টি সহজভাবে বিশ্লেষণ করা যাক।
বর্তমান পরিস্থিতি ও চিঠির মূল কথা
সম্প্রতি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চালাচালি হওয়া চিঠিপত্র এবং নির্দেশনার সারসংক্ষেপ করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে:
১. অর্থ মন্ত্রণালয়ের অবস্থান (ছুটির বিধিমালা ১৯৫৯):
অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, শিক্ষকদের ‘ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্ট’ বা অবকাশ বিভাগের যে সংজ্ঞা রয়েছে, তা আধুনিক বাস্তবতায় পর্যালোচনা ও সংশোধন করা যেতে পারে। যেহেতু সরকারি কর্মচারীদের নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা (১৯৫৯)-এর ৮ নম্বর বিধিতে এই ছুটির কথা বলা আছে, তাই এই বিধিটি সংশোধনের মূল এখতিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয়ের হাতেই রয়েছে। জনপ্রশাসন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথ খুঁজতে বলা হয়েছে।
২. জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গি:
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিষয়টি বেশ নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করেছে। তারা বলছে, পুরো শিক্ষা খাতকে ঢালাওভাবে ‘নন-ভ্যাকেশন’ ঘোষণা করলে কিছু প্রশাসনিক জটিলতা হতে পারে। তবে, বিসিএস (সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষা) ক্যাডারের সদস্য এবং কলেজের শিক্ষকদের শ্রান্তি বিনোদন ছুটি এবং গড় বেতনে অর্জিত ছুটি পাওয়ার দাবিটি অত্যন্ত যৌক্তিক। শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় চাইলে অর্থ বিভাগের সম্মতি নিয়ে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।
৩. জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫-এর সবুজ সংকেত:
এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় অগ্রগতিটি এসেছে জাতীয় বেতন কমিশন, ২০২৫-এর কাছ থেকে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে শিক্ষকদের ‘নন-ভ্যাকেশন’ সুবিধা দেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। এর প্রেক্ষিতে গত ২৬ নভেম্বর, জাতীয় বেতন কমিশন স্পষ্ট জানিয়েছে—২০১৩ সালের বেতন ও চাকরি কমিশন শিক্ষকদের নন-ভ্যাকেশন সুবিধা দেওয়ার যে সুপারিশ করেছিল, তা সম্পূর্ণ সঠিক ও বাস্তবানুগ।
এই ইতিবাচক মতামতের ভিত্তিতেই এখন মাউশি, অর্থ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে পরবর্তী চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাস্তব উদাহরণ: ‘ভ্যাকেশন’ থেকে ‘নন-ভ্যাকেশন’ হলে শিক্ষকদের লাভ কী?
বিষয়টি একটু সহজে বোঝার জন্য আমরা দুজন সরকারি কর্মকর্তার উদাহরণ টানতে পারি।
ধরা যাক, জনাব আরিফ একজন বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডার কর্মকর্তা (নন-ভ্যাকেশন) এবং জনাব হাসান একজন বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডার কর্মকর্তা (ভ্যাকেশন)।
- বর্তমান অবস্থা (ভ্যাকেশন): জনাব হাসান বছরে হয়তো লম্বা ছুটি পান, কিন্তু প্রতি ৩ বছর পর জনাব আরিফ যখন পরিবারের সাথে ঘোরার জন্য ১৫ দিনের ছুটি ও সাথে এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ টাকা (শ্রান্তি বিনোদন ভাতা) পান, জনাব হাসান তা পান না। আবার অবসরে যাওয়ার সময় জনাব আরিফ তার না কাটানো অর্জিত ছুটির বিনিময়ে এককালীন বড় অঙ্কের টাকা (সর্বোচ্চ ১৮ মাসের মূল বেতন) পান, যেখানে জনাব হাসানের অর্জিত ছুটি জমা হয় খুবই কম হারে। অথচ ছুটির দিনেও জনাব হাসানকে কলেজের ভর্তি বা পরীক্ষার ডিউটি করতে হয়।
- পরিবর্তিত অবস্থা (নন-ভ্যাকেশন হলে): শিক্ষা খাত নন-ভ্যাকেশন ঘোষিত হলে বা অন্তত আর্থিক সুবিধাগুলো দেওয়া হলে, জনাব হাসানও অন্যান্য ক্যাডার কর্মকর্তাদের মতো প্রতি তিন বছর পর শ্রান্তি বিনোদন ভাতা পাবেন এবং অবসরের সময় অর্জিত ছুটির সম্পূর্ণ আর্থিক সুবিধা লাভ করবেন। এতে সরকারি চাকরিতে আন্তঃক্যাডার বৈষম্য দূর হবে।
খোলাবইয়ের বিশ্লেষণ: একটি ইতিবাচক ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ
শিক্ষকদের এই দাবিটি দীর্ঘদিনের। কলেজের শিক্ষকরা সারা বছর ক্লাস, অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা, পাবলিক পরীক্ষা (এইচএসসি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়), খাতা মূল্যায়ন এবং প্রশাসনিক কাজে যুক্ত থাকেন। খাতায়-কলমে ছুটি থাকলেও বাস্তবে তাদের কাজের চাপ কম নয়।
সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় বেতন কমিশন বিষয়টি অনুধাবন করে যে ইতিবাচক মতামত দিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। এটি বাস্তবায়িত হলে:
- শিক্ষকদের মধ্যে পেশাগত হতাশা ও বৈষম্যবোধ দূর হবে।
- তারা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন, যা অবসরের পর তাদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
- শিক্ষকতায় মেধাবীদের আকর্ষণ আরও বাড়বে।
তবে, ১৯৫৯ সালের বিধিমালা সংশোধন একটি আইনি প্রক্রিয়া। তাই শিক্ষা, জনপ্রশাসন এবং অর্থ মন্ত্রণালয়কে দ্রুত সমন্বয় করে একটি সুনির্দিষ্ট প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে।
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, আর শিক্ষকরা সেই মেরুদণ্ডের রূপকার। শিক্ষকদের সম্মানজনক ও বৈষম্যহীন পেশাগত জীবন নিশ্চিত করা মানেই একটি সমৃদ্ধ আগামী নিশ্চিত করা। আশা করা যায়, খুব শিগগিরই সরকারি কলেজের শিক্ষকরা এই কাঙ্ক্ষিত সুসংবাদটি পাবেন।
তথ্যসূত্র: অর্থ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও জাতীয় বেতন কমিশন, ২০২৫-এর আন্তঃমন্ত্রণালয় পত্র এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের দাপ্তরিক নির্দেশনা।
