সর্বশেষ খবর
ওয়েবসাইট কেন দরকার, খরচ কত — নিজেই বানান ওয়েবসাইট পর্ব ১

ওয়েবসাইট কেন দরকার, খরচ কত? ফেসবুক পেজ বনাম নিজের ওয়েবসাইট — নিজেই বানান ওয়েবসাইট, পর্ব ১

নিজেই বানান ওয়েবসাইট — পর্ব ১। এটি একটি ধারাবাহিক টিউটোরিয়াল সিরিজের প্রথম পর্ব। সিরিজের সব পর্বের তালিকা ও ক্রম পাবেন সিরিজের মূল পাতায়।

“স্যার, আমাদের তো ফেসবুক পেজ আছেই, ওয়েবসাইট দিয়ে আর কী হবে?” — কথাটা আমি বহুবার শুনেছি; সহকর্মীদের কাছে, কোচিং চালানো বন্ধুদের কাছে, এমনকি ছোট ব্যবসা করা আত্মীয়ের কাছেও। প্রশ্নটা অন্যায্য নয়। ফেসবুক পেজ খুলতে এক মিনিট লাগে, এক টাকাও লাগে না, আর সবাই সেখানেই আছে। তাহলে ওয়েবসাইটের পেছনে টাকা আর সময় খরচ করার যুক্তি কী?

এই পর্বে সেই প্রশ্নের সোজাসাপ্টা উত্তর দেব, আর সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটা মানুষকে থামিয়ে দেয় — “কত টাকা লাগবে?” — তার হিসাবটা টাকায়-পয়সায় মিলিয়ে দেখাব। শেষে বলব কোন কোন ক্ষেত্রে ওয়েবসাইট আসলেই দরকার নেই, যাতে অকারণে কেউ টাকা খরচ না করেন।

ফেসবুক পেজ কেন যথেষ্ট নয়

ফেসবুক পেজের মূল সমস্যা একটাই: পেজটা আপনার নয়, ফেসবুকের। বাকি সব সমস্যা এখান থেকেই আসে।

প্রথমত, আপনার পোস্ট কে দেখবে তা ঠিক করে ফেসবুকের অ্যালগরিদম, আপনি নন। পাঁচ হাজার ফলোয়ারের পেজে একটা জরুরি নোটিশ দিলে বাস্তবে হয়তো তিন-চারশো জনের কাছে পৌঁছায়। ওয়েবসাইটে নোটিশটা ঠিকানায় গিয়ে যে কেউ, যখন খুশি, দেখতে পান।

দ্বিতীয়ত, গুগলে আপনাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। একজন অভিভাবক যখন গুগলে লেখেন “চট্টগ্রাম ইপিজেড স্কুল ভর্তি”, ফলাফলে ওয়েবসাইট আসে, ফেসবুক পোস্ট প্রায় আসেই না। যাঁরা আপনাকে এখনো চেনেন না, তাঁদের কাছে পৌঁছানোর একমাত্র পথ গুগল, আর গুগলের দরজা ওয়েবসাইট।

তৃতীয়ত, পুরোনো তথ্য হারিয়ে যায়। গত বছরের ভর্তি বিজ্ঞপ্তি, ক্লাস রুটিন, পরীক্ষার ফলাফল — ফেসবুকে সেগুলো খুঁজে বের করা প্রায় অসম্ভব; ছয় মাস পর সেই পোস্ট স্ক্রল করে কে পাবে? ওয়েবসাইটে প্রতিটি তথ্যের একটা স্থায়ী ঠিকানা থাকে, যা বছরের পর বছর এক থাকে।

চতুর্থত, আস্থা। যে প্রতিষ্ঠানের নিজের ডোমেইনে ওয়েবসাইট আর ইমেইল আছে, তাকে মানুষ স্বভাবতই বেশি গুরুত্ব দেয়। একটা সরকারি দপ্তর, ব্যাংক বা বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় যখন আপনার প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানতে চায়, তারা ফেসবুক পেজ খোঁজে না, ওয়েবসাইট খোঁজে।

আর সবশেষে, নিয়ন্ত্রণ। ফেসবুক যেকোনো দিন নিয়ম বদলাতে পারে, পেজ রেস্ট্রিক্ট করতে পারে, এমনকি হ্যাক হয়ে গেলে বছরের পর বছরের পরিশ্রম এক রাতে হাওয়া। নিজের ডোমেইন আর হোস্টিং থাকলে এই ঝুঁকি আপনার হাতে, অন্য কারও হাতে নয়। ফেসবুক পেজ থাকুক — সেটা প্রচারের জন্য চমৎকার — কিন্তু আপনার স্থায়ী ঠিকানা হোক নিজের ওয়েবসাইট; পেজ থেকে মানুষ সেখানেই আসবে।

কার কী কাজে লাগে

স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা: নোটিশ বোর্ড, ক্লাস রুটিন, পরীক্ষার সময়সূচি ও ফলাফল, ভর্তি তথ্য ও অনলাইন আবেদন, শিক্ষক-কর্মচারীর তালিকা, ছুটির তালিকা, প্রতিষ্ঠান পরিচিতি। আমার নিজের প্রতিষ্ঠানে অভিজ্ঞতা বলে, ফলাফল আর ভর্তির মৌসুমে একটা ওয়েবসাইট অফিসের শত শত ফোনকল বাঁচিয়ে দেয়। (এই সিরিজের পর্ব ৮-এ ঠিক এই জিনিসগুলো কীভাবে বানাবেন, তা হাতে-কলমে দেখাব।)

কোচিং সেন্টার ও শিক্ষক: ব্যাচের সময়সূচি, ভর্তি ফরম, লেকচার শিট ও সাজেশন, শিক্ষার্থীদের ফলাফল — আর একজন শিক্ষকের জন্য নিজের লেখা, ক্লাসনোট ও পরিচিতির একটা স্থায়ী ঠিকানা। এই খোলা বই সাইটটি নিজেই তার উদাহরণ।

ছোট ব্যবসা ও দোকান: পণ্যের তালিকা, দাম, অর্ডার নেওয়া, ঠিকানা ও যোগাযোগ। ফেসবুকে ইনবক্সে দরদাম করার বদলে ওয়েবসাইটে অর্ডার এলে হিসাব রাখা সহজ হয়, ক্রেতার আস্থাও বাড়ে। (বোনাস পর্বে একটি বইয়ের দোকানের অনলাইন সংস্করণ বানানোর পুরো অভিজ্ঞতা শেয়ার করব।)

পেশাজীবী ও সংগঠন: আইনজীবী, ডাক্তার, হিসাবরক্ষক, পরামর্শক — কিংবা কোনো সমিতি, ক্লাব বা অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন — সবার জন্যই একটা সাইট মানে “আমরা আছি, এই আমাদের ঠিকানা”।

একটা ওয়েবসাইট আসলে কী কী দিয়ে তৈরি

খরচের হিসাবে যাওয়ার আগে তিনটি শব্দ পরিষ্কার হওয়া দরকার, কারণ টাকাটা এই তিন খাতেই যায়। একটা দোকানের সঙ্গে তুলনা করলে ব্যাপারটা সহজ হয়ে যায়।

ডোমেইন হলো আপনার ঠিকানা — যেমন kholaboi.info। দোকানের সাইনবোর্ড আর ঠিকানার মতো; এটা ছাড়া কেউ আপনাকে খুঁজে পাবে না। বছরে একবার ভাড়া দিতে হয়।

হোস্টিং হলো দোকানঘরটা — ইন্টারনেটে একটা কম্পিউটারে কিছুটা জায়গা, যেখানে আপনার সাইটের ফাইল, ছবি আর লেখা থাকে এবং যা দিনরাত ২৪ ঘণ্টা চালু। এটাও বছরে (বা মাসে) ভাড়া।

সফটওয়্যার হলো দোকানের সাজসজ্জা আর তাক — যে জিনিস দিয়ে আপনি পাতা বানান, লেখা পোস্ট করেন, মেনু সাজান। আমরা ব্যবহার করব ওয়ার্ডপ্রেস, যা পৃথিবীর প্রতি দশটা ওয়েবসাইটের চারটিরও বেশি চালায় এবং সম্পূর্ণ বিনামূল্যের।

অর্থাৎ নিয়মিত খরচ মাত্র দুটো: ডোমেইন আর হোস্টিং। বাকিটা — ওয়ার্ডপ্রেস, থিম, বেশিরভাগ প্লাগইন, এমনকি SSL সার্টিফিকেট (ঠিকানার আগে যে তালা চিহ্নটা থাকে) — আজকাল বিনামূল্যেই মেলে।

খরচ কত: টাকায়-পয়সায় হিসাব

নিচের হিসাবটা অক্টোবর ২০২৬-এর বাজারদর অনুযায়ী, বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকাশিত মূল্যতালিকা থেকে নেওয়া। দাম বছরে একটু-আধটু ওঠানামা করে, ডলারের দরের সঙ্গেও বদলায়, তাই এগুলোকে সঠিক অঙ্ক নয়, বাস্তবসম্মত সীমা হিসেবে দেখুন।

খাতআনুমানিক খরচ ও মন্তব্য
.com ডোমেইনপ্রথম বছর ৳১,২০০ (±), পরের বছর থেকে ৳১,৫০০–১,৬০০
সবচেয়ে চেনা ও নিরাপদ পছন্দ। প্রথম বছরের ছাড়ের দাম দেখে না ভুলে রিনিউয়ালের দাম দেখুন।
.com.bd / .edu.bd ডোমেইনরেজিস্ট্রেশন বছরে ৳৭০০, রিনিউয়াল ৳১,০২০ (+ভ্যাট)
বিটিসিএল থেকে; জানুয়ারি ২০২৬-এ দাম কমানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের জন্য .edu.bd বাড়তি আস্থা দেয়, তবে কাগজপত্র লাগে।
শেয়ার্ড হোস্টিং (স্টার্টার)বছরে ৳৩,৫০০–৫,০০০
একটি স্কুল বা কোচিংয়ের সাইটের জন্য যথেষ্ট। মানসম্মত বাংলাদেশি হোস্টে স্টার্টার প্ল্যান মাসে ৳৩০০–৪০০-র মতো পড়ে; ছাড়ে প্রথম বছর কম।
SSL সার্টিফিকেট৳০
ভালো হোস্টে Let’s Encrypt SSL বিনামূল্যে ও স্বয়ংক্রিয়। কেউ আলাদা টাকা চাইলে সন্দেহ করুন।
ওয়ার্ডপ্রেস + থিম + প্লাগইন৳০ (ঐচ্ছিক প্রিমিয়াম থিম এককালীন ৳৫,০০০–৮,০০০)
ফ্রি থিম দিয়েই চমৎকার সাইট হয়; এই সিরিজে আমরা ফ্রি দিয়েই করব।
নিজের ডোমেইনে ইমেইল৳০ (হোস্টিংয়ের সঙ্গে) অথবা Google Workspace: প্রতি ব্যবহারকারী মাসে প্রায় ৭ ডলার
শুরুতে হোস্টিংয়ের ফ্রি ইমেইলই চলে; পর্ব ৯-এ বিস্তারিত।
মোট (প্রথম বছর)প্রায় ৳৪,৫০০–৬,৫০০
পরের বছরগুলোতে ৳৫,০০০–৬,৫০০ — মাসে হিসাব করলে ৫০০ টাকারও কম।

তুলনার জন্য: কোনো ডেভেলপার বা এজেন্সিকে দিয়ে একই রকম সাইট বানালে এককালীন ১৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা তো লাগেই, তার ওপর প্রতিবার একটা নোটিশ বদলাতে বা নতুন পাতা যোগ করতে তাঁর দ্বারস্থ হতে হয়, আর বছর শেষে “মেইনটেন্যান্স চার্জ”। নিজে বানালে প্রথম বছরের খরচটা একজন শিক্ষার্থীর এক মাসের কোচিং ফি-র সমান, আর সাইটের পুরো নিয়ন্ত্রণ আপনার হাতে।

ফ্রি-তে কি হয় না?

হয় — এবং সৎ উত্তর হলো, কারও কারও জন্য ফ্রি-ই যথেষ্ট। Google Sites, Blogger বা WordPress.com-এর ফ্রি প্ল্যানে কোনো টাকা ছাড়াই একটা সাইট খোলা যায়। একজন শিক্ষক যদি শুধু নিজের ক্লাসনোট শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শেয়ার করতে চান, কিংবা একটা ক্লাব যদি বছরে দু-চারটা ঘোষণা দিতে চায়, তাদের জন্য এগুলো দিয়েই শুরু করা ভালো।

কিন্তু একটা প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসার জন্য ফ্রি প্ল্যানের তিনটা সীমাবদ্ধতা বড় হয়ে দাঁড়ায়। ঠিকানাটা হয় আপনারনাম.blogspot.com বা আপনারনাম.wordpress.com — নিজের ডোমেইন বসাতে গেলেই টাকা লাগে, আর সেই টাকা প্রায়ই নিজের হোস্টিংয়ের চেয়ে বেশি। প্ল্যাটফর্মের বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ডিং আর নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। আর যেদিন ফরম, ফলাফল খোঁজার ব্যবস্থা বা অনলাইন ভর্তির মতো কিছু দরকার হবে, সেদিন দেখবেন ফ্রি প্ল্যানে দরজা বন্ধ। তখন সব কনটেন্ট নতুন জায়গায় সরানোর ঝামেলা। তাই প্রতিষ্ঠানের জন্য আমার পরামর্শ: ছোট করে শুরু করুন, কিন্তু নিজের ডোমেইন ও হোস্টিং দিয়েই শুরু করুন।

শুরুর আগে চারটি সতর্কতা

এক — ডোমেইন যেন আপনার নামে থাকে। এটা সবচেয়ে জরুরি কথা। অনেক প্রতিষ্ঠান কোনো পরিচিত “কম্পিউটারের ভাই”-কে দিয়ে সাইট বানায়, ডোমেইন থাকে তাঁর অ্যাকাউন্টে। দু-বছর পর তিনি উধাও, কিংবা সম্পর্ক খারাপ — ডোমেইন আর ফেরত পাওয়া যায় না। ডোমেইন ও হোস্টিং কিনুন প্রতিষ্ঠানের নিজের ইমেইল দিয়ে খোলা নিজের অ্যাকাউন্টে; কাজ অন্য কেউ করলেও মালিকানা আপনার।

দুই — “লাইফটাইম হোস্টিং” বলে কিছু নেই। এককালীন দুই-তিন হাজার টাকায় “আজীবন” হোস্টিংয়ের বিজ্ঞাপন দেখলে দূরে থাকুন। সার্ভারের খরচ প্রতি মাসে হয়; যিনি আজীবনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তিনি দু-বছর পর থাকবেন কি না সন্দেহ।

তিন — অতিরিক্ত সস্তার ফাঁদ। বছরে ৫০০–৮০০ টাকার হোস্টিং বাজারে আছে। সেগুলোতে সাইট ধীর চলে, প্রায়ই বন্ধ থাকে, আর সমস্যায় পড়লে সাপোর্ট পাওয়া যায় না। হোস্টিংয়ে বছরে দু-তিন হাজার টাকা বাঁচিয়ে ফলাফল প্রকাশের দিন সাইট ডাউন থাকলে সেই সাশ্রয়ের কোনো মানে নেই।

চার — রিনিউয়ালের তারিখ লিখে রাখুন। ডোমেইনের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যে কেউ সেটা কিনে নিতে পারে — এবং এমন ঘটনা বাংলাদেশে বহু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘটেছে। অটো-রিনিউ চালু রাখুন, আর ক্যালেন্ডারে তারিখটা তুলে রাখুন।

এই পর্বের সারকথা

ফেসবুক পেজ প্রচারের জায়গা, ওয়েবসাইট আপনার স্থায়ী ঠিকানা — দুটোর কাজ আলাদা। একটা প্রতিষ্ঠান বা ছোট ব্যবসার সাইট নিজে বানালে প্রথম বছরে খরচ মোটামুটি সাড়ে চার থেকে সাড়ে ছয় হাজার টাকা, তারপর বছরে পাঁচ-ছয় হাজার; এর বেশিরভাগই ডোমেইন আর হোস্টিংয়ের ভাড়া, বাকি সব বিনামূল্যে। আর যা-ই করুন, ডোমেইন নিজের নামে, নিজের অ্যাকাউন্টে রাখুন।

পরের পর্বে

পর্ব ২: ডোমেইন নাম বাছাই — .com, .info, .com.bd না .edu.bd, কোনটা কখন; ভালো নামের নিয়ম; আর বিটিসিএল থেকে .bd ডোমেইন নেওয়ার ধাপে ধাপে পদ্ধতি। প্রকাশিত হলে এখানে লিংক যুক্ত হবে।

← সিরিজের সব পর্ব এক পাতায়

About The Author

খোলাবই বুকশপ এন্ড স্টেশনারিজ

পড়াশোনার সব উপকরণ এক জায়গায়

বই, খাতা, ডায়েরি, প্র্যাকটিক্যাল খাতা, ড্রয়িং ও স্টেশনারি — ঘরে বসে অর্ডার করুন। সারা দেশে ডেলিভারি, ক্যাশ অন ডেলিভারি সুবিধা।

দোকানে যানকুপন KHOLABOI50 — ৳৫০০+ অর্ডারে ৳৫০ ছাড়

ডেলিভারি চার্জ: চট্টগ্রামে ৳৭৫ • সারা দেশে ৳১৫০  |  অর্ডার ও তথ্য: ০১৬১০৯৩৫৩৫৬

About Admin

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।