
চমৎকার ঘ্রাণ, মিষ্টি স্বাদ, আকর্ষণীয় সবুজ-হলুদ রং এবং দীর্ঘ সময় সতেজ থাকার ক্ষমতার জন্য কাঞ্চন পেয়ারা দেশজুড়ে সমাদৃত। চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পেয়ারার ফলন বেশ ভালো হয়েছে এবং দামও ভালো পাওয়ায় কৃষকেরা বেজায় খুশি।
ব্রিটিশ আমল থেকেই দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ ও পটিয়ায় প্রাথমিকভাবে কাঞ্চন পেয়ারার উৎপাদন শুরু হয়। পাহাড়ি জনপদজুড়ে এখন সবুজের রাজত্ব; যতদূর চোখ যায়, পাহাড়ের ঢালে সারি সারি পেয়ারা গাছ এবং গাছে গাছে ঝুলছে থোকায় থোকায় পেয়ারা। এখন চলছে কাঞ্চন পেয়ারার ভরা মৌসুম। পটিয়া ও চন্দনাইশে প্রায় ৯০০ হেক্টর জমিতে পাঁচ হাজারের বেশি ছোট-বড় বাগান রয়েছে বলে কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়। এসব বাগান থেকে বছরে প্রায় ১০ হাজার মেট্রিক টন পেয়ারা উৎপাদিত হয়। চন্দনাইশ, পটিয়া ও আশপাশের বেশ কয়েকটি উপজেলাসহ চট্টগ্রাম নগরী—সবখানেই পাওয়া যাচ্ছে কাঞ্চন পেয়ারা। কাঞ্চননগরের পেয়ারা আকারে ছোট হলেও এর স্বাদ, ঘ্রাণ ও মচমচে গঠন ক্রেতাদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয়। স্থানীয়ভাবে এটি ‘কাঞ্চন পেয়ারা’, ‘গোয়াছি’ বা ‘গয়াম’ নামেও পরিচিত। চন্দনাইশের ঐতিহ্যবাহী কাঞ্চন পেয়ারা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের বাজারেও রপ্তানি হচ্ছে।
সম্ভাবনার নেপথ্য সংকট: সম্ভাবনার এই গল্পের আড়ালে রয়েছে চাষিদের দীর্ঘদিনের বেশ কিছু সংকট। বন্যায় বাগানের ক্ষতি, সংরক্ষণের জন্য হিমাগারের অভাব, দ্রুত পচনশীল ফল হওয়ায় বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং আধুনিক বিপণনব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। ফলে বাম্পার ফলন হলেও কাঙ্ক্ষিত লাভের মুখ দেখার নিশ্চয়তা থাকে না চাষিদের। সম্প্রতি চন্দনাইশ সফরে এসে কৃষিমন্ত্রী দক্ষিণ চট্টগ্রামের উৎপাদিত কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য মিনিহিমাগার স্থাপন করার কথা বলেছেন। পেয়ারাচাষিরা বলছেন, পেয়ারা সংরক্ষণাগার, আধুনিক প্যাকেজিং সেন্টার ও কোল্ড-চেইন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে মৌসুমের চাপ অনেকটাই কমে আসবে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে পাল্প, জুস, জেলি, আচার ও শুকনো পেয়ারা তৈরির ক্ষুদ্রশিল্প গড়ে উঠলে ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও কমবে।
বেচাকেনা ও বাজারব্যবস্থা: প্রতিদিন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটিসংলগ্ন রওশনহাটে বসে কাঞ্চন পেয়ারার বিশাল বাজার। এ ছাড়া মহাসড়কের বাদামতল, বাগিচাহাট ও দোহাজারী সদরেও পেয়ারার বাজার বসে। পেয়ারা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত চাষিরা প্রতিদিন গভীর রাতে ডর-ভয় উপেক্ষা করে গহীন অরণ্যের পেয়ারা বাগানে চলে যান। ভোরের আলো ফুটতেই পেয়ারা কাঁধে বহন করে কয়েক কিলোমিটার পায়ে হেঁটে চলে আসেন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে। পাইকাররা সেখান থেকে পরিমাণমতো পেয়ারা কিনে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরবরাহ করেন। কোনো ধরনের ক্ষতিকারক কীটনাশক প্রয়োগ ছাড়াই উৎপাদিত হওয়ায় এটি অর্গানিক পেয়ারা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চল কাঞ্চননগর, হাশিমপুর, দোহাজারী ও ধোপাছড়ি এখন ‘পেয়ারা গ্রাম’ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। কাঞ্চননগরে সর্বাধিক পেয়ারা উৎপাদিত হওয়ার কারণে এলাকার নামের সাথে মিল রেখে এর নাম হয়েছে ‘কাঞ্চন পেয়ারা’।
উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা: উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষিবিদ আজাদ হোসেন জানান, চলতি মৌসুমে ৭৫৫ হেক্টর জমিতে দুই হাজার পেয়ারা বাগান করেছেন বাগানিরা। প্রতি হেক্টরে ১৫ মেট্রিক টন ধরে ১১ হাজার ৩২৫ টন পেয়ারা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। প্রতি টন পেয়ারা ৮৫ হাজার টাকা ধরে প্রায় ৯৬ কোটি টাকার অধিক মূল্যে পেয়ারা বিক্রি করতে পারবেন বাগান মালিকরা। জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ২০২৪ সালের প্রথম দিকে ইউএনও অফিসের মাধ্যমে কাঞ্চন পেয়ারার বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে জেলা অফিসে সকল তথ্য প্রেরণ করা হয়।
পেয়ারা বাগান করে কয়েক হাজার মানুষ তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে নিয়েছেন। শত শত বেকার যুবক স্বাবলম্বী হয়ে পরিবারের হাল ধরেছেন। পাশাপাশি সংগ্রহ ও পরিবহনে কয়েক হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই পেয়ারা চাষ করে শূন্য থেকে লাখপতিতে পরিণত হয়েছেন। এ অঞ্চলে উৎপাদিত পেয়ারা সংরক্ষণের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় কৃষি বিপণন বিভাগ থেকে হিমাগার নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
চলতি মৌসুমে পেয়ারার ফলন ভালো হওয়ায় চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। সাইজ অনুযায়ী বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতি ডজন ছোট আকারের পেয়ারা ৫০ থেকে ৭৫ টাকায় এবং বড় সাইজের প্রতি ডজন ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিক্রির নির্দিষ্ট কোনো স্থান না থাকায় বিক্রেতারা মহাসড়কের পাশেই বিক্রি করেন। প্রতিদিন ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে বেচাকেনা। কাঞ্চননগর থেকে দোহাজারী পর্যন্ত শত শত কিশোর ও যুবক পেয়ারা নিয়ে মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থেকে চলাচলরত বিলাসবহুল গাড়ির যাত্রীদের কাছেও খুচরা বিক্রি করেন।
চাষিদের দাবি ও নিরাপত্তা ঝুঁকি: ধোপাছড়ি ইউনিয়নের চাপাছড়ি এলাকার পেয়ারা বাগান মালিক ইকবাল হোসেন জানান, পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় কোনো ধরনের বাড়তি যত্নআত্তি ছাড়াই এখানে প্রচুর পেয়ারা উৎপাদন হয়। এখানকার পেয়ারা সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ হওয়ায় সারা দেশে এর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। আধুনিক প্রশিক্ষণ ও সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করা হলে এ অঞ্চলের চাষিরা দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবেন। প্রতি মৌসুমে কোটি কোটি টাকার পেয়ারা উৎপাদিত হলেও সরকারি এসব পাহাড় যাতে চাষিরা স্থায়ী বন্দোবস্ত পান, সে দাবি জানিয়েছেন অনেকেই।
পাশাপাশি, মাঝেমাধ্যে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের কর্তৃক বাগানমালিক ও শ্রমিকদের অপহরণের ঘটনার অভিযোগ রয়েছে। শারীরিক নির্যাতন ও বিপুল অঙ্কের মুক্তিপণ আদায়ের হাত থেকে রক্ষায় চন্দনাইশের পাহাড়ি অঞ্চলে সন্ত্রাসীদের তৎপরতা কমাতে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন পেয়ারা বাগান মালিক ও শ্রমিকরা।
KholaBoi শিক্ষা, পরীক্ষা ও ক্যারিয়ার নিয়ে নির্ভরযোগ্য বাংলা তথ্যভান্ডার